কার্যাদেশের শর্ত তোয়াক্কা না করে মধ্যরাতে ঢালাই জলঢাকা বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজে সরকারি ভবন নির্মাণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ
- আপডেট সময় : ১২:৫১:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩ জুন ২০২৬ ১৫০ বার পড়া হয়েছে

মোঃনুরুজ্জামান নীলফামারী
নীলফামারীর জলঢাকায় অবস্থিত ‘জলঢাকা বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজ’ (জেবিএমআই)-এর নতুন একাডেমিক ভবন নির্মাণ কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (EED) নির্ধারিত নিয়মনীতি ও কার্যাদেশের শর্তাবলীর কোনো তোয়াক্কা না করে, পবিত্র ঈদের আগের দিন গভীর মধ্যরাতে তড়িঘড়ি করে ভবনের মূল কলাম (খুঁটি) ঢালাইয়ের কাজ করার সময় ঠিকাদারি পক্ষের প্রতিনিধিরা হাতেনাতে ধরা পড়েছেন। সরকারি দপ্তরের কোনো তদারকি প্রকৌশলী ছাড়াই অন্ধকারে এই ঢালাই কাজ চলায় স্থানীয় জনগণের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও ভবনের স্থায়িত্ব নিয়ে মারাত্মক সংশয় দেখা দিয়েছে।সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (EED) নীলফামারীর বাস্তবায়নাধীন ‘ডেভেলপমেন্ট অব সিলেক্টেড নন-গভর্নমেন্ট এডুকেশনাল ইনস্টিটিউশন (কোড নং- ৭০১৬)’ প্রকল্পের আওতায় কলেজটিতে চার তলা ভিত্তিবিশিষ্ট এক তলা একাডেমিক ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। দাপ্তরিক কার্যাদেশ অনুযায়ী, সরকারি প্রাক্কলিত বাজেট ১ কোটি ৩৮ লাখ ৬৩ হাজার টাকা হলেও ১০ শতাংশ কম দর তথা ১ কোটি ২৪ লাখ ৭৬…৭০০ টাকা চুক্তিমূল্যে কাজটি পায় চট্টগ্রামের নাসিরাবাদের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মোহাম্মদ ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স (প্রা:) লিমিটেড’। তবে স্থানীয় সূত্র মতে, একটি সাব-ঠিকাদারি পক্ষ মাঠপর্যায়ে কাজটি পরিচালনা করছে।গত কোরবানি ঈদের আগের দিন মধ্যরাতে কোনো প্রকার প্রকৌশলগত তদারকি কিংবা পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা ছাড়াই সম্পূর্ণ অন্ধকারের মধ্যে তড়িঘড়ি করে কলাম ঢালাইয়ের কাজ শুরু করে ঠিকাদার পক্ষ। গভীর রাতে মিক্সার মেশিনের শব্দ ও সন্দেহজনক তৎপরতা দেখে স্থানীয় বাসিন্দা ও সংবাদকর্মীদের একটি দল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। সেখানে দেখা যায়, তীব্র অন্ধকারের মাঝে নামমাত্র আলোতে শ্রমিকরা ঝুঁকিপূর্ণভাবে ঢালাইয়ের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এ সময় উপস্থিত সরকারি কোনো কর্মকর্তা বা প্রকৌশলীকে সাইটে পাওয়া যায়নি।ঘটনাস্থলে কাজের মান ও রাতের অন্ধকারে ঢালাইয়ের কারণ জানতে চাইলে কর্মরত প্রধান মিস্ত্রি আমিনুর রহমান প্রথমে সদুত্তর দিতে ব্যর্থ হন। তিনি দাবি করেন, তারা নাকি বেশিরভাগ বড় কাজ রাতেই করে থাকেন। তবে সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতি এবং আলোবিহীন অবস্থায় কেন এই সংবেদনশীল কাজ করা হচ্ছে। এমন প্রশ্নের মুখে তিনি কখনো মূল ঠিকাদার আবার কখনো কলেজের প্রভাবশালী শিক্ষকদের মৌখিক নির্দেশের কথা বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন।এ বিষয়ে নীলফামারী শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার সবুজ হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যেকোনো ধরনের আরসিসি ঢালাইয়ের কাজ অবশ্যই পর্যাপ্ত দিনের আলোতে এবং আমাদের সরাসরি উপস্থিতিতে সন্ধ্যার আগেই শেষ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। মধ্যরাতে চোরের মতো অন্ধকারে ঢালাই করার কোনো নিয়ম নেই। আমরা এ ধরনের কাজের কোনো অনুমোদন দেইনি এবং একে কঠোরভাবে নীতিবহির্ভূত হিসেবে গণ্য করছি।
নির্মাণাধীন ভবনের প্রতিবেশী ও স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ভবনের মূল ভিত্তি হচ্ছে এর কলাম বা পিলার। সেই পিলারের ঢালাই যদি গভীর রাতে লুকিয়ে করা হয়, তবে রড, সিমেন্ট ও বালুর সঠিক অনুপাত বজায় রাখা কখনই সম্ভব নয়। কার্যাদেশ অনুযায়ী ১ কোটি ২৪ লাখ টাকার এই বিশাল সরকারি কাজে প্রকৌশলীদের অনুপস্থিতি প্রমাণ করে যে এখানে বড় ধরনের আর্থিক ও গুণগত অনিয়ম লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা চলছে। এভাবে কাজ হলে ভবিষ্যতে ভবনটি ধসে পড়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।এদিকে জলঢাকা বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আজিজার রহমান বলেন, ওইদিনের কাজের ব্যাপারে আমরা কিছুই জানিনা।অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে তড়িঘড়ি করে এই অতিগুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক ভবনের কাজ শেষ করার অপচেষ্টায় জলঢাকা উপজেলার সচেতন নাগরিক সমাজ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। স্থানীয় সচেতন মহল অবিলম্বে এই নৈশকালীন ঢালাইয়ের কাজ বাতিল করে ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে ঢালাইয়ের গুণগত মান পরীক্ষা করার দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হস্তক্ষেপ কামনা করে এই নির্মাণ কাজের সামগ্রিক অনিয়ম ও অধ্যক্ষের দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি উচ্চপর্যায়ের সুষ্ঠু তদন্ত কমিটি গঠনের জোর দাবি জানানো হয়েছে।


















